advertisement

৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস শেফালী বেগমের, স্বপ্ন দেখছেন অনার্সে ভর্তির


কালের চাকা | প্রতিবেদক: সম্পাদক ও প্রকাশক প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৫০ পূর্বাহ্ণ
৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস শেফালী বেগমের, স্বপ্ন দেখছেন অনার্সে ভর্তির

ছবি : কাজী আব্দুল আজিম (সুমন)

advertisement
কাজী আব্দুল আজিম (সুমন)

শৈশবে বাবাকে হারিয়ে থেমে যায় পড়াশোনা। পরিবারের আর্থিক সংকট ও সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বিসর্জন দিতে হয় নিজের স্বপ্নকে। বিয়ে, সংসার ও সন্তানদের বড় করতে গিয়ে আর ফেরা হয়নি বই-খাতার জগতে। তবে মনের গভীরে শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্নটি কখনো হারিয়ে যায়নি। অবশেষে ৪৮ বছর বয়সে আবারও হাতে তুলে নেন বই-খাতা। দীর্ঘ অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানে বয়স ও প্রতিকূলতা। ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নীলফামারীর শেফালী বেগম।

শেফালী বেগম নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ নক্তপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মোকছেদুল আলম মঞ্জুর স্ত্রী।

জানা যায়, অল্প বয়সেই ফুফাতো ভাই মোকছেদুল আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৮৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে চলে আসেন তিনি। এরপর সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব পালনে থেমে যায় তাঁর শিক্ষাজীবন। তবে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন সব সময়ই লালন করেছেন তিনি।

সংসার সামলানোর পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন শেফালী। ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত হন। টানা দুই মেয়াদে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সালে স্বামী ও ছেলের অনুপ্রেরণায় আবারও পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। ডোমার উপজেলার গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের ফলে ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ অর্জন করেন।

শেফালী জানান, সংসারের কাজ শেষ করে প্রতিদিন রাত ৯টার পর পড়তে বসতেন। কখনো কখনো রাত ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত পড়াশোনা করতেন। কোনো প্রাইভেট শিক্ষক না থাকলেও ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সন্তানদের সহযোগিতা নিয়েছেন। নিয়মিত অধ্যয়ন, পরিশ্রম ও ধৈর্য তাঁকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে।

নিজের অনুভূতি জানিয়ে শেফালী বেগম বলেন, “উচ্চশিক্ষা নেওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই স্বামীর বাড়িতে চলে আসতে হয়। এরপর সংসার ও সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সন্তানদের সফলতা আমাকে আবার পড়াশোনা শুরু করতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এই বয়সে এসে পেরেছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। এবার অনার্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।”

তাঁর স্বামী মোকছেদুল আলম বলেন, “আমরা সব সময় তাঁকে উৎসাহ দিয়েছি। বলেছি, ভালো ফলাফল করতে হবে না, অন্তত পাস করে আসুক। পড়াশোনার জন্য যাতে সময় পান, সে জন্য সংসারের কাজেও সহযোগিতা করেছি।”

মায়ের সাফল্যে আনন্দিত বড় ছেলে আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, “মায়ের এই সাফল্যে আমি ভীষণ আনন্দিত। আমি ভাগ্যবান সন্তানদের একজন। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”

মেয়ে মাকছুরা খানম বলেন, “আমার মায়ের এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের নয়, এটি সমাজের সব নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা।”

শেফালী বেগমের এই অর্জন প্রমাণ করে, শিক্ষার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও দায়িত্বের মধ্যেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে স্বপ্ন পূরণ সম্ভব। ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাসের পর এবার অনার্সে ভর্তির স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তাঁর এই পথচলা নিঃসন্দেহে সমাজের অনেক নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর